গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় উৎসব মুখোর পরিবেশে ৩ দিনব্যাপী নৌকা বাইচ উৎসব শুরু হয়েছে ।
স্বতঃস্ফুর্ত এ নৌকা বাইচ ২শ’ বছরের প্রচীন ও ঐতিহ্যবাহী। কেউ এটির আয়োজন করে না। স্থানীয়দের কাছে বিল বাঘিয়ার নৌকা বাইচ হিসেবে সমধিক পরিচিত। প্রতি বছরের মতো এ বছরও এ নৌকা বাইচকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার মানুষের মিলন মেলা বসেছে কোটালীপাড়া উপজেলার কলাবাড়ি ইউনিয়নের কালিগঞ্জে।
আজ সোমবার (২৬ অক্টোবর) দুপুর থেকে নান্দনিক এ নৌকা বাইচ বিপুল আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে শুরু হয়ে চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত। প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্যে লালিত দুশ’বছরের আকর্ষণীয় এ নৌকা বাইচে গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর , পিরোজপুর , বরিশাল জেলার প্রত্যন্ত গ্রামের সরেঙ্গা,ছিপ,কোষা,চিলাকাটা,জয়নগর বাচারী নৌকা অংশ নেয়। আবহমান গ্রাম বাংলার অতি প্রাচীন কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও নিজস্বতা ধরে রাখতে হাজারো প্রাণের আনন্দ উচ্ছালতায় কোটালীপাড়া উপজেলার বিল বাঘিয়ার বাবুর খালে কালিগঞ্জ বাজার থেকে খেজুরবাড়ি পর্যন্ত ২ কিঃমিঃ এলাকা জুড়ে নৌকা বাইচ ও মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে । এখানে বাড়তি আকর্ষণ নৌকায় নৌকায় মেলা । হাজার হাজার মানুষ দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে নৌকা বাইচ প্রত্যক্ষ করেন । দুপুর থেকে নানা বর্ণে ও বিচিত্র সাজে সজ্জিত দৃষ্টি নন্দন এসব নৌকা তুমুল বাইচ শুরু করে। সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে নৌকা বাইচের একের পর এক ছোপ।
ঠিকারী ও কাঁশির বাদ্যের তালে জারি সারি গান নেচে গেয়ে – হেঁইও হেঁইও রবে বৈঠার ছলাৎ- ছলাৎ শব্দে এক অনবদ্য আবহ সৃষ্টি হয়। খালের দু’ কূলে দাঁড়িয়ে থাকা হাজার হাজার মানুষের হৃদয়ে জাগে দোলা। মাল্লাদের সাথে সমবেত হন অগনিত সমর্থক ও দর্শক। তারা উৎসাহ দেন বাইচের নৌকার মাল্লাদের। খালের দু’পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের করতালী ও হর্যধ্বনিতে এলাকা মুখরিত হয়ে ওঠে। গোটা এলাকায় সঞ্চারিত হয় উৎসবের আমেজ।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ২য় দিনেও দুপুর থেকে নৌকা বাইচ উৎসব শুরু হয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলবে। তৃতীয় বা শেষ দিনে বুধবার (২৮ অক্টোবর) দুপুর থেকে শুরু হয়ে সন্ধ্যায় এ নৌকা বাইচ উৎসব সমাপ্ত হবে। ভাঙবে মিলন মেলা।
কোটালীপাড়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল বশার হাওলাদার বলেন , ছোট বেলা থেকে এ নৌকা বাইচ দেখে আসছি। এখানে কখনোই কাউকে বিশেষ দায়িত্ব নিয়ে বাইচের আয়োজন করতে হয় না। স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে মাঝি মাল্লারা নৌকা নিয়ে এসে নৌকা বাইচ উৎসব করে আসছেন। এখানে কোন আয়োজক কমিটি নেই। কোন পুরস্কারের ব্যবস্থা করা হয় না। তারপরও ২০০ বছর ধরে এ নৌকা বাইচ উৎসব হয়ে আসছে। এটি কোটালীপাড়ার একটি ঐতিহ্য। সব প্রতিকূলতাকে প্রতিহত করে আমরা এটিকে টিকিয়ে রাখব ।
কালিগঞ্জের নৌকা বাইচ দেখতে আসা শিক্ষার্থী অনণ্যা হালদার, প্রিয়ন্তি রায় পিউ , গ্রহবধূ জ্যোৎস্না অধিকারী, বলেন, জীবনে অনেক স্থানের নৌকা বইচ দেখেছি। কিন্তু এখানকার মতো এত বড় , কালার ফুল ও রাজকীয় ঢং এর নৌকা বাইচ আমরা দেখিনি।
বাইচার কোটালীপাড়া উপজেলার নৈয়ারবাড়ি গ্রামের সুকমল সরকার বলেন, আমরা ৩ দিনের নৌকা বাইচ উৎসবে অংশ নিয়ে দর্শনার্থীদের আনন্দ দেই। আমরাও আনন্দ উপভোগ করি। শত শত বছর ধরে আমাদের পূর্ব পুরুষরা এই উৎসবে অংশ নিয়ে ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছে। আমরা সেই ধারবাহিকতাকে ধরে রেখেছি। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এটিকে ধরে রাখবে। আগে বিলে নৌকা বাইচ হত। এখন বিলে পানি নেই। তাই খালে বাইচ হয়। খাল যতদিন টিকে থাকবে ততদিন নৌকা বাইচ হবে। এ কারণে আমরা বাবুর খাল সংরক্ষণের দাবি জানাই।
কলাবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এ্যাড. বিজন বিশ্বাস মুঠোফোনে বলেন, নদী মাতৃক এ অঞ্চলের ২ শ’ বছরের ঐতিহ্যবাহী বাঘিয়া বিলের নৌকা বাইচ টিকিয়ে রাখতে হবে। আবহমান গ্রাম বাংলার অতি প্রাচীন কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও নিজস্বতা আগামী প্রজন্মকে ধরে রাখার আহবান জানাচ্ছি।
