হরমুজ প্রণালী সংলগ্ন জলপথে ফের বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার অভিযোগ ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়েছে আন্তর্জাতিক মহলে। ওমান উপকূলের কাছে ভারতীয় নাবিক থাকা দুটি জাহাজে ড্রোন হামলার পর নিখোঁজ হয়েছেন দুই ভারতীয় নাবিক। তাঁদের সন্ধানে তল্লাশি শুরু করেছে ওমানের উপকূলরক্ষী বাহিনী। এই ঘটনার পর ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নয়াদিল্লি। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা অবিলম্বে বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক।
হামলার ঘটনায় নিখোঁজ দুই নাবিকের নাম বীর বাহাদুর যাদব ও অমিত সিং। তাঁদের খোঁজে উদ্ধার অভিযান চলছে বলে জানা গিয়েছে। ভারতের বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। আন্তর্জাতিক জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলিকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করার আহ্বানও জানিয়েছে দিল্লি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রবিবার ওমান উপকূলের কাছে নোঙর করে থাকা নিকারাগুয়া ও মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকাবাহী দুটি জাহাজে ড্রোন হামলার অভিযোগ ওঠে। প্রতিটি জাহাজে ১১ জন করে ভারতীয় নাবিক ছিলেন। হামলার পর থেকে বীর বাহাদুর যাদব ও অমিত সিংয়ের কোনও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।
ঘটনার খবর সামনে আসার পর তাঁদের খোঁজে তল্লাশি শুরু করেছে ওমানের উপকূলরক্ষী বাহিনী। নিখোঁজ নাবিকদের বর্তমান অবস্থান এবং হামলার ফলে জাহাজ দুটির কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনও স্পষ্ট নয়।
সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর এ ধরনের হামলা নাবিকদের জীবন বিপন্ন করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহণেও অনিশ্চয়তা তৈরি করে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথের কাছে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে তার প্রভাব পড়তে পারে জ্বালানি পরিবহণ ও বিশ্ববাণিজ্যে।
ঘটনার পর সোমবার ভারতের বিদেশ মন্ত্রক হামলার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি প্রকাশ করে। বিবৃতিতে ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে একের পর এক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নয়াদিল্লি।
ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্য, এই ধরনের হামলা অব্যাহত থাকলে হরমুজ প্রণালী সংলগ্ন অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। তাই অবিলম্বে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বন্ধ করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া হরমুজ প্রণালী-সহ আন্তর্জাতিক জলপথগুলিতে অবাধ ও নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে ভারত। বিদেশ মন্ত্রক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে পদক্ষেপ করার আহ্বান জানিয়েছে।
ভারতের বক্তব্য, সামরিক উত্তেজনা ও সংঘাতের মধ্যে সাধারণ নাবিক এবং বাণিজ্যিক জাহাজকে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া উচিত নয়। আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মিটিয়ে আন্তর্জাতিক জলপথে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দিয়েছে নয়াদিল্লি।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে এই সংকীর্ণ জলপথ। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে অপরিশোধিত তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও অন্যান্য পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছনোর ক্ষেত্রে এই প্রণালীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। নিরাপত্তার ঝুঁকি বেড়ে গেলে জাহাজ পরিচালনাকারী সংস্থাগুলিকে অতিরিক্ত সতর্কতা নিতে হয়। কখনও কখনও জাহাজের যাত্রাপথ পরিবর্তন, বিমার খরচ বৃদ্ধি এবং পণ্য পরিবহণে বিলম্বের মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে তেলবাহী জাহাজের চলাচল ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির দামে ওঠানামা দেখা দিতে পারে।
তাই হরমুজ প্রণালী সংলগ্ন অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলির বিষয় নয়। এর সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বার্থও জড়িত।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানের ওপর আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ হামলার পর থেকে হরমুজ প্রণালী সংলগ্ন অঞ্চলে উত্তেজনা বেড়েছে। সেই পরিস্থিতিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের প্রভাব আন্তর্জাতিক জলপথে ছড়িয়ে পড়লে বাণিজ্যিক জাহাজের নাবিকদের ঝুঁকির মুখে পড়তে হয়। বিশেষ করে ভারতীয় নাবিকেরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পতাকাবাহী জাহাজে কাজ করেন। ফলে আন্তর্জাতিক জলপথে নিরাপত্তার অবনতি হলে ভারতীয় নাগরিকদের সুরক্ষার বিষয়টি নয়াদিল্লির কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এই পরিস্থিতিতে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের ওপর জোর দিয়েছে। সামরিক উত্তেজনা কমিয়ে আন্তর্জাতিক জলপথে নিরাপদ চলাচল বজায় রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলির মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে সাম্প্রতিক হামলার সঙ্গে নির্দিষ্ট কোনও পক্ষের সরাসরি যোগ রয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য ছাড়া সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
হরমুজ প্রণালী সংলগ্ন অঞ্চলে ভারতীয় নাবিক থাকা বাণিজ্যিক জাহাজ আক্রান্ত হওয়ার অভিযোগ এই প্রথম নয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৯ অক্টোবর ওমান উপকূলের কাছে পানামার পতাকাবাহী একটি জাহাজে একই ধরনের ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছিল।
সেই জাহাজে ২২ জন ভারতীয় নাবিক ছিলেন। তবে ওই ঘটনায় তাঁদের প্রত্যেকেই নিরাপদে ছিলেন বলে জানা গিয়েছে।
পরপর এ ধরনের ঘটনার খবর সামনে আসায় আন্তর্জাতিক জলপথে কর্মরত ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বাণিজ্যিক জাহাজে কর্মরত নাবিকেরা সাধারণত বিভিন্ন দেশের জলসীমা অতিক্রম করে পণ্য পরিবহণ করেন। সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে তাঁদের কাজ করতে হলে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে হয়।
ভারতের মতো দেশ, যেখানকার বহু নাগরিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে কাজ করেন, তাদের জন্য নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও মানবিক বিষয়।
বীর বাহাদুর যাদব ও অমিত সিংয়ের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় তাঁদের পরিবার এবং সহকর্মীদের উদ্বেগ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ওমানের উপকূলরক্ষী বাহিনীর তল্লাশি অভিযানের মাধ্যমে তাঁদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার অপেক্ষা চলছে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল নিখোঁজ নাবিকদের সন্ধান পাওয়া এবং জাহাজে থাকা অন্য কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি হামলার প্রকৃতি, ক্ষয়ক্ষতি এবং ঘটনার পেছনের কারণ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন।
ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের বিবৃতিতে স্পষ্ট করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক জলপথে নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন মেনে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলিকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ওমান উপকূলে ভারতীয় নাবিক থাকা দুটি জাহাজে হামলার অভিযোগ হরমুজ প্রণালী সংলগ্ন অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। দুই নিখোঁজ নাবিকের সন্ধান, হামলার তদন্ত এবং বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দিকেই এখন নজর রয়েছে। দিল্লি অবিলম্বে হামলা বন্ধ করে আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছে।
