উচ্চ বেতনে চাকরির প্রলোভনে দালালের খপ্পরে পড়ে রাশিয়ায় গিয়ে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন গোপালগঞ্জের দুই যুবক। তাঁদের একজন সদর উপজেলার বোড়াশী গ্রামের রনি ফকির। যিনি ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন।
অন্যজন, গোপালগঞ্জ সদর উপজেরার ঘোষেরচর গ্রামের পলাশ শেখ ড্রোন হামলায় হারিয়েছেন একটি হাত। বর্তমানে পলাশ মস্কোর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। রনির মৃত্যুর খবরে পরিবারে চলছে শোকের মাতম। আর পলাশকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের সহযোগিতা চেয়ে আকুতি জানাচ্ছেন স্বজনরা।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৭ মে ঢাকার খিলক্ষেত এলাকার জাবালে নূর নামের একটি এজেন্সির মাধ্যমে কনস্ট্রাকশন কোম্পানিতে চাকরির ভিসায় রাশিয়ায় যান রনি ফকির। তাঁর সঙ্গে গোপালগঞ্জের আরও দুই যুবকসহ দেশের অন্ততঃ ৩০ জন যুবক একইভাবে রাশিয়ায় পাড়ি জমান।
তবে রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাঁদের কনস্ট্রাকশন কোম্পানির কাজে না দিয়ে দালালচক্র রাশিয়ার সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে স্বল্প সময়ের সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে তাঁদের পাঠানো হয় ইউক্রেনের বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে।
গত ২৯ অক্টোবর দুপুরেও মায়ের সঙ্গে কথা হয়েছিল রনির। এর কিছুক্ষণ পরই ইউক্রেনের একটি ড্রোন হামলায় তিনি নিহত হন। তাঁর সঙ্গে যুদ্ধে থাকা লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার এক বাংলাদেশি যুবক রনির মৃত্যুর খবর তাঁর পরিবারকে জানান। পরে মরদেহের ছবি পাঠালে তা দেখে রনিকে শনাক্ত করেন তাঁর বাবা-মা।
ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা। সরকারের কাছে তাঁদের একটাই দাবি, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দূতাবাসের মাধ্যমে রনির মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হোক, যাতে শেষবারের মতো ছেলের মুখ দেখে তাঁকে দাফন করতে পারেন তাঁরা।
রনি ফকিরের বাবা নুর ইসলাম কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন, দালাল চক্র আমার ছেলেকে কনস্ট্রাকশন কোম্পানীতে কাজ দেবার কথা বলে আমার কাছ থেকে ১০ লাখা টাকা নিয়েছে। এরপর আমার ছেলেকে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর হাতে বিক্রি করে দিয়েছে। এত দিন ছেলেরে চিন্তায় অনেক কান্নাকাটি করেছি। এখন আমার ছেলেটি ড্রোন হামলায় মারা গেছে। আমরা তো আর আমাদের ছেলেকে ফেরত পাবো না, অন্তত ছেলের লাশটা যেন ফেরত পাই। এর সঙ্গে তিনি দালাল চক্রের সদস্যদের বিচারের দাবি জানান এবং তাঁদের ফাঁসি চান।
অন্যদিকে, পরিবারের অভাব-অনটন দূর করে সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় রাশিয়ায় গিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছেন গোপালগঞ্জের সবজি ব্যবসায়ী পলাশ শেখ। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, স্থানীয় দালাল রেজা কতৃক জাবালে নূর নামের একটি এজেন্সির মাধ্যমে রাশিয়ায় যাওয়ার পর তাঁকেও রাশিয়ার সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরে যুদ্ধে পাঠানো হলে ড্রোন হামলায় তাঁর একটি হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। গত ১ মাস ধরে তিনি মস্কোর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, উন্নত জীবনের আশায় ধারদেনা করে বিদেশে গিয়েছিলেন পলাশ। পরিবারের সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে রাশিয়ায় পাড়ি জমালেও এখন নিজেই জীবন-মৃত্যুর সংকটে পড়েছেন। তিনি দেশে ফিরতে চান। তাঁর বাবা মো. জামিল শেখ ছেলেকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা কামনা করেছেন। একই সঙ্গে তাঁকে রাশিয়ায় পাঠানোর নামে প্রতারণার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে বিচারের দাবি জানিয়েছেন।

পরিবারের সদস্যরা জানান, পলাশের জীবনের গল্প অত্যন্ত বেদনা দায়ক। ছোটবেলায় মাকে হারান তিনি। তাঁর বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করার পর পলাশসহ তিন ভাইবোনের দায়িত্ব পড়ে বৃদ্ধ নানা মোশারফ হোসেনের ওপর। অনেক কষ্টে বড় করা নাতির যুদ্ধে গিয়ে একটি হাত হারানোর খবর শুনে ভেঙে পড়েছেন তিনি। পলাশকে দেশে ফিরিয়ে আনার আকুতি জানিয়েছেন পরিবারের অন্য সদস্যরাও।
পলাশের চাচি শেফালী বেগম বলেন, ছোটবেলায় মাকে হারানো পলাশ তাঁর চোখের সামনেই অভাব-অনটনের মধ্যে বড় হয়েছেন। অনেক সময় তাঁকে খাবারও দিয়েছেন তিনি। পলাশের এমন দুর্দশার কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। দ্রুত তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করার দাবি জানান।
এদিকে, পলাশকে দেশে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতা চেয়েছেন তাঁর ফুপা মুন্সী আইয়ুব আলী ও ফুপাতো ভাই রাজীব মুন্সী। তাঁরা পলাশের চিকিৎসা নিশ্চিত করে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
গোপালগঞ্জের দুই যুবকের এমন পরিণতিতে উদ্বিগ্ন তাঁদের পরিবার। স্বজনদের দাবি, রনির মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি পলাশের চিকিৎসা নিশ্চিত করে তাঁকে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে। একই সঙ্গে উচ্চ বেতনে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে যুবকদের বিদেশে নিয়ে যুদ্ধে পাঠানোর সঙ্গে জড়িত দালালচক্রকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
